এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সুকান্ত ভট্টাচার্য রচিত ‘গীতিগুচ্ছ’ গ্রন্থের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য ও তুলনামূলক কম আলোচিত দিক হলো তাঁর সংগীতসৃষ্টি। বাংলা সাহিত্যে সুকান্ত প্রধানত ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ, শোষণ, বৈষম্য ও সংগ্রামের কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিসর কেবল কবিতা ও ছড়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সংগীতের প্রতিও তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি গান রচনা করেছেন। কবির অকালপ্রয়াণের পর তাঁর সংগীতসৃষ্টির একটি অংশ একত্রে সংকলিত ও প্রকাশিত হয় ‘গীতিগুচ্ছ’ নামে। সংকলনটিতে মোট উনিশটি গান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই গানগুলোর মধ্য দিয়ে সুকান্তের বহুল পরিচিত দ্রোহী ও প্রতিবাদী সত্তার পাশাপাশি তাঁর অনুভূতিশীল, কোমল, প্রেমময় ও সুরসচেতন মননের একটি ভিন্ন পরিচয় উন্মোচিত হয়।
‘গীতিগুচ্ছ’ সুকান্তের সাহিত্যিক পরিচয়কে একটি বিস্তৃততর পরিসরে দেখার সুযোগ করে দেয়। তাঁর কবিতায় যে তীব্র সামাজিক সচেতনতা ও বাস্তবতাবোধ লক্ষ করা যায়, এই সংকলনের গানগুলোতে তার পাশাপাশি ব্যক্তিমানসের আবেগ, প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রেম, বিরহ, জীবন-মৃত্যুর অনুভব এবং সংগীতের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। ফলে সুকান্তকে কেবল রাজনৈতিক বা গণমুখী কবিতার কবি হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের যে অংশটি আড়ালে থেকে যায়, ‘গীতিগুচ্ছ’ সেই অংশটিকে সামনে নিয়ে আসে।
এই সংকলনের গানগুলোর ভাষা ও চিত্রকল্পে বাংলা গীতিকবিতার ঐতিহ্যের প্রভাব যেমন অনুভূত হয়, তেমনি সুকান্তের নিজস্ব সংবেদনশীলতারও পরিচয় পাওয়া যায়। কোথাও প্রকৃতির আবেশ, কোথাও প্রেম ও আকুলতা, কোথাও জীবন সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি—বিভিন্ন অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে গানগুলো বৈচিত্র্যময়। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, সুকান্তের পরিচিত কঠোর বাস্তববাদী কণ্ঠস্বরের পাশাপাশি এখানে একটি কোমল ও গীতল কণ্ঠও শোনা যায়।
‘গীতিগুচ্ছ’-এর গুরুত্ব তাই শুধু উনিশটি গান সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সৃষ্টিশীল সত্তার একটি অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত অধ্যায়ের দলিল। তাঁর কবিতার পাঠক এই সংকলনের মাধ্যমে কবির অনুভূতির আরও ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ পান। একই সঙ্গে এটি তাঁর সাহিত্যকর্মের বৈচিত্র্য ও শিল্পবোধ সম্পর্কে একটি পূর্ণতর ধারণা তৈরি করে।
নিচে ‘গীতিগুচ্ছ’-এ অন্তর্ভুক্ত উনিশটি গানের প্রথম পঙ্ক্তি বা মুখবন্ধ ক্রমানুসারে দেওয়া হলো:
- ওগো কবি তুমি আপন ভোলা।
- এই নিবিড় বাদল দিনে।
- গানের সাগর পাড়ি দিলাম।
- হে মোর মরণ, হে মোর মরণ।
- দাঁড়াও ক্ষণিক পথিক হে।
- শয়ন শিয়রে ভোরের পাখির রবে।
- ও কে যায় চলে কথা না বলে দিও না যেতে।
- হে পাষাণ, আমি নির্ঝরিণী।
- শীতের হাওয়া ছুঁয়ে গেল ফুলের বনে।
- কিছু দিয়ে যাও এই ধূলিমাখা পান্থশালায়।
- ক্লান্ত আমি, ক্লান্ত আমি কর ক্ষমা।
- সাঁঝের আঁধার ঘিরল যখন।
- কঙ্কণ-কিঙ্কিণী মঞ্জুল মঞ্জীর ধ্বনি।
- মেঘ-বিনিন্দিত স্বরে।
- গুঞ্জরিয়া এল অলি।
- কোন অভিশাপ নিয়ে এল এই।
- ভুল হল বুঝি এই ধরণীতলে।
- মুখ তুলে চায় সুবিপুল হিমালয়।
- ফোটে ফুল আসে যৌবন।