এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সমরেশ মজুমদার রচিত ‘ফেরারী’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
সমরেশ মজুমদারকে আমরা সাধারণত সমাজবাস্তবতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েন কিংবা দীর্ঘ চরিত্রনির্ভর উপন্যাসের লেখক হিসেবেই বেশি চিনি। কিন্তু ফেরারী সেই পরিচিত সমরেশ মজুমদারের থেকে কিছুটা আলাদা। এটি এমন এক অদ্ভুত ও কল্পনাপ্রবণ উপন্যাস, যেখানে একটি অসম্ভব ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষের সমাজ, সম্পর্ক, প্রেম, কামনা, পরিচয় এবং বেঁচে থাকার অর্থ নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়ায়।
উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে কলকাতার এক সাধারণ যুবক স্বপ্নেন্দু। তার জীবন শুরু হয় একেবারেই পরিচিত শহুরে বাস্তবতার মধ্যে—অফিস, দেরি, দৈনন্দিন ব্যস্ততা এবং ব্যক্তিগত আকর্ষণ-অনাকর্ষণের সাধারণ জগৎ নিয়ে। কিন্তু হঠাৎ এক অদ্ভুত পরিবর্তনে গোটা কলকাতার মানুষ তাদের পরিচিত শারীরিক রূপ হারিয়ে ফেলে। রক্ত-মাংসের শরীরের পরিবর্তে মানুষ পরিণত হয় কঙ্কালসদৃশ অস্তিত্বে, অথচ তাদের চেতনা, কথা বলা, চলাফেরা ও অনুভূতির ক্ষমতা থেকে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ কিংবা বিস্ময়কর ব্যাপার—মৃত্যুও যেন তাদের নাগালের বাইরে চলে যায়।
এই অসম্ভব পরিস্থিতিই ফেরারী-কে কেবল দুর্যোগের গল্প হতে দেয় না; বরং উপন্যাসটি হয়ে ওঠে মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে এক ধরনের রূপকধর্মী অনুসন্ধান।
মানুষের শরীরের সঙ্গে তার সামাজিক পরিচয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নারী-পুরুষ, সুন্দর-কুৎসিত, তরুণ-বৃদ্ধ, ধনী-দরিদ্র—মানুষের বহু পার্থক্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে শরীর ও বাহ্যিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে। ফেরারী-তে সেই পরিচিত শরীরের বিলোপের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে—তাহলে মানুষ আসলে কে?
যদি সৌন্দর্য না থাকে, যৌবন না থাকে, শরীরের আকর্ষণ না থাকে, এমনকি মৃত্যুভয়ও না থাকে—তবে প্রেমের অর্থ কী? সম্পর্কের ভিত্তিই বা কোথায়?
সমরেশ মজুমদার এই প্রশ্নগুলোর সরাসরি দার্শনিক উত্তর দেন না। বরং স্বপ্নেন্দু এবং তার চারপাশের মানুষদের আচরণের মধ্য দিয়ে পাঠককে সেই উত্তর খুঁজতে বাধ্য করেন। বাহ্যিক রূপ বদলে গেলেও মানুষের ভেতরের আকাঙ্ক্ষা, ঈর্ষা, প্রেম, অধিকারবোধ কিংবা একাকিত্ব যে এত সহজে বদলায় না, উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মানুষ যুগ যুগ ধরে মৃত্যুকে পরাজিত করার স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু ফেরারী সেই স্বপ্নকেই উল্টে দিয়ে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে—মৃত্যু না থাকলে জীবন কি সত্যিই সুন্দর থাকবে?
মৃত্যু মানুষের জীবনে ভয় নিয়ে আসে, কিন্তু সেই মৃত্যুই হয়তো জীবনের মূল্যও তৈরি করে। সময় সীমিত বলেই ভালোবাসা জরুরি, বিচ্ছেদ বেদনাদায়ক, অর্জন মূল্যবান এবং জীবন অর্থপূর্ণ। অথচ যখন মৃত্যুর সম্ভাবনাই দূর হয়ে যায়, তখন বেঁচে থাকাও একসময় অর্থহীন ও ক্লান্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
এই দিক থেকে ফেরারী-কে নিছক বিজ্ঞানকল্প বা ফ্যান্টাসি বলা কঠিন। এর মধ্যে আছে ব্যঙ্গ, সামাজিক পর্যবেক্ষণ, অস্তিত্বের সংকট এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা। সমকালীন পাঠকদের আলোচনাতেও বইটির ধরন নিয়ে এই দ্বিধা দেখা যায়—এটি বিজ্ঞানকল্প, ফ্যান্টাসি, ব্যঙ্গ না প্রেমের উপন্যাস—একটি নির্দিষ্ট ঘরানায় একে সহজে আবদ্ধ করা যায় না।
উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক স্বপ্নেন্দুর ব্যক্তিগত সম্পর্কের জটিলতা। হেনা এবং আত্রেয়ীকে কেন্দ্র করে তার আবেগ ও সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়, তা উপন্যাসের অদ্ভুত কল্পজগতকে মানবিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে।
শরীর বদলে গেলেও মানুষের মন বদলায় না—এই বিষয়টি সম্ভবত উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অন্তঃস্রোত। বাহ্যিক সৌন্দর্য হারিয়ে যাওয়ার পরেও আকর্ষণ থাকে, ভালোবাসা থাকে, অধিকারবোধ থাকে এবং সম্পর্কের মধ্যে জটিলতাও থেকে যায়।
অর্থাৎ মানুষ কেবল শরীর নয়—আবার শরীরকে পুরোপুরি অস্বীকার করেও মানুষকে বোঝা যায় না। ফেরারী এই দ্বন্দ্বটিকেই অত্যন্ত অদ্ভুত এক পরিস্থিতির মধ্যে স্থাপন করেছে।
সমরেশ মজুমদারের দীর্ঘ ও বিস্তৃত উপন্যাসগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ফেরারী অনেক বেশি সংক্ষিপ্ত এবং ধারণানির্ভর। প্রচলিত সামাজিক বাস্তবতার বদলে এখানে লেখক একটি অসম্ভব ঘটনাকে বাস্তবের মতো গ্রহণ করে তার পরিণতি অনুসন্ধান করেছেন।
এই কারণেই উপন্যাসটির শুরু পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। প্রথমে এটি শহুরে জীবনের একটি সাধারণ গল্প বলে মনে হলেও ধীরে ধীরে কাহিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে প্রবেশ করে। বিভিন্ন পাঠ-প্রতিক্রিয়াতেও এই আকস্মিক রূপান্তরকে বইটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমরেশের গদ্যের একটি বড় শক্তি হলো—তিনি অস্বাভাবিক ঘটনাকেও খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বর্ণনা করতে পারেন। ফলে পাঠক অসম্ভব ঘটনাটিকে গ্রহণ করতে শুরু করে এবং তারপর সেই ঘটনার সামাজিক ও মানসিক পরিণতি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়।
তবে ফেরারী সবার জন্য সমান উপভোগ্য নাও হতে পারে। যারা সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার, কালবেলা, সাতকাহন বা অন্য দীর্ঘ সামাজিক উপন্যাসের মতো বিস্তৃত চরিত্রনির্মাণ আশা করবেন, তাদের কাছে এটি তুলনামূলকভাবে ছোট এবং ভিন্নধর্মী মনে হতে পারে।
উপন্যাসের মূল কল্পনাটি অত্যন্ত শক্তিশালী হলেও কেউ কেউ হয়তো এর বৈজ্ঞানিক যুক্তি বা ঘটনার বাস্তব ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে হতাশ হতে পারেন। কিন্তু বইটিকে বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যার উপন্যাস হিসেবে না দেখে একটি রূপকধর্মী কল্পকাহিনি হিসেবে পড়লে এর প্রকৃত শক্তি বেশি স্পষ্ট হয়।
ফেরারী মূলত এমন একটি উপন্যাস, যা একটি অদ্ভুত প্রশ্ন দিয়ে পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে—
যদি মানুষ তার শরীর হারিয়েও বেঁচে থাকে, আর মৃত্যু যদি তার কাছে না আসে—তবে সে আসলে কী নিয়ে বাঁচবে?
এই প্রশ্নের মধ্যেই উপন্যাসটির আকর্ষণ।
এটি শুধু কঙ্কাল হয়ে যাওয়া মানুষের গল্প নয়; এটি মানুষের পরিচয় হারানোর গল্প। এটি শুধু অমরত্বের গল্প নয়; বরং মৃত্যুর প্রয়োজনীয়তার গল্প। এটি শুধু প্রেমের গল্পও নয়; বরং প্রশ্ন তোলে—প্রেম কি কেবল চোখে দেখা শরীরের প্রতি, নাকি মানুষের অদৃশ্য সত্তার প্রতিও?
সমরেশ মজুমদারের জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর তুলনায় ফেরারী হয়তো কম আলোচিত, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীলতার ভিন্ন একটি দিক দেখার জন্য এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। অল্প পরিসরের মধ্যে বিজ্ঞানকল্প, ফ্যান্টাসি, সামাজিক ব্যঙ্গ, মনস্তত্ত্ব ও প্রেমের উপাদান মিলিয়ে তিনি এমন এক কাহিনি নির্মাণ করেছেন, যা শেষ করার পরও পাঠকের মনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়—অমর হওয়ার চেয়ে কি মরণশীল মানুষ হিসেবেই বেঁচে থাকা ভালো নয়?