দেবী

হুমায়ূন আহমেদ

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘দেবী’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

হুমায়ূন আহমেদের ‘দেবী’ বাংলা সাহিত্যের রহস্য, মনস্তত্ত্ব ও অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতাকে একসঙ্গে নিয়ে নির্মিত অন্যতম সফল উপন্যাস। ১৯৮৫ সালের জুনে প্রকাশিত এই উপন্যাসের মধ্য দিয়েই পাঠকের সামনে আত্মপ্রকাশ করে মিসির আলি চরিত্রটি; পরবর্তীকালে তিনিই হুমায়ূন আহমেদের অন্যতম জনপ্রিয় ও স্বতন্ত্র চরিত্রে পরিণত হন।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রানু। তাঁর আচরণ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার মধ্যে এমন কিছু অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, যা সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় সহজে ধরা পড়ে না। তিনি এমন কিছু বিষয় অনুভব বা জানতে পারেন, যার প্রত্যক্ষ উৎস তাঁর জানা থাকার কথা নয়। ফলে তাঁর চারপাশে ক্রমে তৈরি হয় ভয়, সংশয় ও রহস্যের আবহ। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ এই রহস্যকে সরাসরি ভূতের গল্পে পরিণত করেননি; বরং পাঠককে বারবার দাঁড় করিয়েছেন দুটি সম্ভাবনার সামনে—ঘটনাগুলো কি মানুষের মনের জটিলতার ফল, নাকি বাস্তবতার প্রচলিত সীমার বাইরে কোনো শক্তির প্রকাশ?

এই দ্বৈততার মধ্যেই ‘দেবী’র প্রধান সাহিত্যিক সাফল্য। উপন্যাসটি পাঠককে কোনো একটি ব্যাখ্যা সহজে গ্রহণ করতে বাধ্য করে না। যুক্তি ও অতীন্দ্রিয়তার মধ্যে যে টানাপোড়েন, সেটিই কাহিনির রহস্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে। বাংলা সাহিত্যে অতিপ্রাকৃত বা ভৌতিক কাহিনি নতুন নয়; কিন্তু ‘দেবী’র বিশেষত্ব হলো, এখানে অতীন্দ্রিয়তার প্রশ্নটি মানুষের মন, স্মৃতি, ভয়, উপলব্ধি এবং অবচেতন মানসিকতার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এখানেই মিসির আলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘দেবী’তে মিসির আলি কেবল রহস্য সমাধানকারী চরিত্র নন; তিনি মূলত উপন্যাসের যুক্তিবাদী বৌদ্ধিক প্রতিপক্ষ। তাঁর কাছে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনাকে প্রথমেই অলৌকিক বলে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, প্রশ্ন করেন, তথ্য সংগ্রহ করেন এবং সম্ভাব্য মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা খোঁজেন। মিসির আলির প্রতি মানুষের আগ্রহের অন্যতম কারণও এখানেই—তিনি রহস্যের সামনে ভয় বা কুসংস্কার নিয়ে দাঁড়ান না, দাঁড়ান যুক্তি নিয়ে। পরবর্তী রচনাগুলোতে তাঁর চরিত্র আরও পূর্ণতা পেলেও ‘দেবী’তেই তাঁর মৌলিক চরিত্রবৈশিষ্ট্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

তবে মিসির আলির সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো, তিনি লেখকের পক্ষ থেকে পাঠককে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ধরিয়ে দেন না। বরং তাঁর যুক্তিবাদী উপস্থিতি রহস্যকে আরও ঘনীভূত করে। একটি ঘটনার মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা সম্ভব—কিন্তু সেই ব্যাখ্যা কি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে? আবার অতীন্দ্রিয় ব্যাখ্যা গ্রহণ করলেই কি সবকিছু সহজ হয়ে যায়? হুমায়ূন আহমেদ এই প্রশ্নগুলোর মাঝখানে পাঠককে রেখে দেন। ফলে মিসির আলি এক অর্থে যুক্তির প্রতিনিধি, আর রানু সেই যুক্তির সীমারেখাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো এক রহস্যময় উপস্থিতি।

‘দেবী’র পরামনোবৈজ্ঞানিক সার্থকতাও মূলত এই জায়গায়। Parapsychology বা পরামনোবিজ্ঞান সাধারণ মনোবিজ্ঞানের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে বলে বিবেচিত টেলিপ্যাথি, অতীন্দ্রিয় উপলব্ধি, পূর্বজ্ঞান ইত্যাদি অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করে। উপন্যাসে এসব বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা নেই; বরং মানুষের অভিজ্ঞতার এমন কিছু অঞ্চলকে কাহিনির উপাদান করা হয়েছে, যেগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ফলে ‘দেবী’কে বৈজ্ঞানিক পরামনোবিজ্ঞানের গ্রন্থ না বলে পরামনোবিজ্ঞান-নির্ভর মনস্তাত্ত্বিক রহস্যোপন্যাস বলা অধিক যথার্থ।

উপন্যাসটির আরেকটি শক্তি হলো এর পরিবেশ নির্মাণ। হুমায়ূন আহমেদ খুব বেশি ব্যাখ্যা না করে সামান্য ইঙ্গিত, আচরণের পরিবর্তন, অস্বাভাবিক অনুভূতি এবং দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিকতার মধ্যে অস্বাভাবিকতাকে প্রবেশ করিয়েছেন। এই কৌশলেই পরিচিত জগতটি ধীরে ধীরে অপরিচিত হয়ে ওঠে। ‘দেবী’র ভয়ের বড় অংশ কোনো দৃশ্যমান আতঙ্ক থেকে আসে না; আসে কী ঘটছে তা নিশ্চিতভাবে বুঝতে না পারার অনুভূতি থেকে। এই মনস্তাত্ত্বিক অনিশ্চয়তাই উপন্যাসটিকে নিছক ভৌতিক কাহিনি থেকে আলাদা করেছে। সমালোচনাতেও উপন্যাসটির রহস্যের কেন্দ্রে মিসির আলির যুক্তিবাদ এবং তার বিপরীতে অজানা বা অতীন্দ্রিয়তার উপস্থিতিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

রানু চরিত্রটিও তাই কেবল ‘অস্বাভাবিক ক্ষমতার অধিকারী নারী’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ভয়, স্মৃতি ও মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়েই উপন্যাসের মূল দ্বন্দ্বটি প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর চরিত্রে সৌন্দর্য, অসহায়ত্ব, রহস্য এবং অজানার সঙ্গে সংযোগ—সব মিলিয়ে এমন একটি আবহ তৈরি হয়েছে, যার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিসির আলির যুক্তিবাদ বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।

‘দেবী’র সাফল্য এখানেই যে, এটি পাঠককে ভয় দেখানোর চেয়ে সন্দেহ করতে শেখায়। কোনো ঘটনা কি সত্যিই ঘটেছে? নাকি মানুষের মস্তিষ্ক তার নিজস্ব বাস্তবতা তৈরি করে? মানুষের উপলব্ধির বাইরে কি কোনো জগৎ থাকতে পারে? আর বিজ্ঞান ও যুক্তি কি সেই জগতের প্রতিটি রহস্যের উত্তর দিতে সক্ষম? এই প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট উত্তর না দিয়েই হুমায়ূন আহমেদ কাহিনিকে এগিয়ে নিয়েছেন।

মিসির আলির আত্মপ্রকাশের কারণে ‘দেবী’ শুধু একটি স্বতন্ত্র উপন্যাস নয়, বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী চরিত্র-পরম্পরারও সূচনা। পরবর্তী সময়ে মিসির আলি বিশটিরও বেশি রচনায় ফিরে এসেছেন এবং যুক্তিবাদী, খানিকটা খেয়ালি অথচ গভীর মানবিক এক চরিত্র হিসেবে পাঠকের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।

সব মিলিয়ে ‘দেবী’কে কেবল হুমায়ূন আহমেদের একটি ভৌতিক বা রহস্যোপন্যাস হিসেবে দেখলে এর সাহিত্যিক গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। এটি একই সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস, রহস্যোপন্যাস এবং পরামনোবৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি—যেখানে যুক্তি ও অযুক্তি, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, মনস্তত্ত্ব ও অতীন্দ্রিয়তার সীমারেখা ক্রমাগত অস্পষ্ট হয়ে যায়। মিসির আলির যুক্তিবাদ এবং রানুর রহস্যময় অভিজ্ঞতার সংঘাতই এই উপন্যাসের প্রাণ। সেই সংঘাতের কোনো সরল মীমাংসা না করেই হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের মনে যে প্রশ্নটি রেখে যান—আমরা যা জানি, তার বাইরেও কি এমন কিছু আছে যা আমরা এখনো বুঝে উঠতে পারিনি?—‘দেবী’র দীর্ঘস্থায়ী আকর্ষণের মূল রহস্য সম্ভবত সেখানেই।