বৃহন্নলা

হুমায়ূন আহমেদ

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘বৃহন্নলা’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

হুমায়ূন আহমেদের ‘বৃহন্নলা’ মিসির আলি-পর্বের একটি স্বতন্ত্র স্বাদের ছোট উপন্যাস/দীর্ঘ গল্প, যেখানে ভৌতিক আবহ, মনস্তাত্ত্বিক রহস্য এবং যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান একসঙ্গে কাজ করেছে। গ্রন্থটি ১৯৮৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং বর্তমানে এটি মিসির আলি সিরিজের পঞ্চম বই হিসেবে তালিকাভুক্ত।

কাহিনির শুরু আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। হুমায়ূন আহমেদের এক আত্মীয়ের বিয়ের সূত্রে তিনি এক মফস্বল এলাকায় যান। পরিস্থিতির কারণে রাতে থাকতে হয় এক নির্জন বাড়িতে, যেখানে তাঁর পরিচয় হয় সুধাকান্তবাবুর সঙ্গে। সুধাকান্তবাবু তাঁকে নিজের জীবনের একটি অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার কথা বলেন। গল্পটি এমনভাবে বলা হয় যে পাঠকের কাছে প্রথমে সেটি নিছক একটি ভৌতিক কাহিনি বলেই মনে হয়। কিন্তু সেখানেই হুমায়ূন আহমেদের কৌশল—তিনি রহস্যের সমাধানকে সরাসরি সামনে না এনে সন্দেহ, আতঙ্ক, স্মৃতি ও যুক্তির নানা স্তর তৈরি করেন।

এরপর কাহিনিতে প্রবেশ করেন মিসির আলি। তিনি ঘটনাটিকে অন্ধভাবে ‘ভূতের কাণ্ড’ বলে মেনে নেন না; বরং ঘটনাগুলোর পেছনে কী বাস্তব কারণ থাকতে পারে, সেটিই অনুসন্ধান করেন। এই দিক থেকেই ‘বৃহন্নলা’ মিসির আলি-সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। মিসির আলির শক্তি তাঁর অলৌকিক ক্ষমতায় নয়, বরং পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং মানুষের আচরণের সূক্ষ্ম পাঠে। ফলে পাঠকও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করতে শেখে—যে ঘটনাকে আমরা অতিপ্রাকৃত বলে মনে করছি, তার পেছনে কি মানুষের মন, স্মৃতি, প্রতারণা কিংবা অন্য কোন বাস্তব ব্যাখ্যা রয়েছে?

উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় সাফল্য এর পরিবেশ নির্মাণে। নির্জন বাড়ি, অস্বাভাবিক নীরবতা, অচেনা মানুষের বর্ণনা, পুরোনো ঘটনার স্মৃতি এবং সুধাকান্তবাবুর কথন—সবকিছু মিলিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এমন একটি আবহ তৈরি করেছেন, যেখানে বাস্তব ও অস্বাভাবিকের সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে আসে। ‘বৃহন্নলা’ নিয়ে পাঠকদের আলোচনাতেও এই ভৌতিক আবহ ও রহস্যের আকর্ষণ বারবার উঠে এসেছে।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল গল্পের ভেতরে গল্প বলার কৌশল। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই কাহিনির কথক হিসেবে উপস্থিত। ফলে লেখক ও তাঁর সৃষ্ট চরিত্র মিসির আলির মধ্যে একটি আকর্ষণীয় সম্পর্ক তৈরি হয়। মিসির আলি যেন লেখকের কাছেই আসা একটি রহস্যের অনুসন্ধানকারী। এই আত্ম-উল্লেখমূলক নির্মাণ কাহিনিটিকে একই সঙ্গে বাস্তব ও কল্পনার মাঝামাঝি একটি অবস্থানে দাঁড় করায়।

‘বৃহন্নলা’র আরেকটি শক্তি এর দৈর্ঘ্য। এটি বিস্তৃত উপন্যাসের মতো বহু চরিত্র বা দীর্ঘ উপকাহিনিতে ছড়িয়ে যায়নি। অল্প পরিসরে একটি রহস্যকে ঘনীভূত করে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাঠক-আলোচনায় বইটির সংক্ষিপ্ত আকার এবং এক বসায় পড়ে ফেলার মতো গতি বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

মিসির আলি চরিত্রের ক্ষেত্রেও ‘বৃহন্নলা’ গুরুত্বপূর্ণ। মিসির আলি এখানে কেবল রহস্য সমাধানকারী নন; তিনি মানুষের বিশ্বাসের সীমা পরীক্ষা করেন। কোন ঘটনা সত্যি কি না—এই প্রশ্নের পাশাপাশি তিনি জানতে চান, মানুষ কেন কোন ঘটনাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। এই মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধানই উপন্যাসটিকে নিছক ভূতের গল্প হওয়া থেকে রক্ষা করেছে।

শিরোনাম ‘বৃহন্নলা’ও কাহিনির সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্ক তৈরি করে। শব্দটির ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক তাৎপর্য রয়েছে; মহাভারতে অর্জুনের বৃহন্নলা-রূপের প্রসঙ্গ সুপরিচিত। উপন্যাসের ক্ষেত্রে শিরোনামটি পরিচয়, প্রকাশ্য সত্তা ও অন্তর্লীন বাস্তবতার প্রশ্নের সঙ্গে একটি প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি করে—যা কাহিনির রহস্যময় আবহকে আরও গভীর করে।

তবে ‘বৃহন্নলা’কে কেবল ‘ভূতের উপন্যাস’ হিসেবে পড়লে এর প্রকৃত বৈশিষ্ট্যের একটি অংশই ধরা পড়বে। এর আসল আকর্ষণ হল বিশ্বাস বনাম যুক্তি, দৃশ্যমান বাস্তবতা বনাম মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতা এবং গল্প বনাম সত্যের সংঘাত। হুমায়ূন আহমেদ পাঠককে কোন একটি ব্যাখ্যা সহজে গ্রহণ করতে বাধ্য করেন না; বরং রহস্যের আবহের মধ্য দিয়ে নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার সুযোগ দেন।

এ কারণেই ‘বৃহন্নলা’ মিসির আলি সিরিজের একটি স্মরণীয় রচনা। পাঠক-সমালোচনাতেও এটি সিরিজটির অন্যতম জনপ্রিয় বই হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে স্থান ধরে রেখেছে; Goodreads-এ বইটির পাঠক-রেটিংও তুলনামূলকভাবে উঁচু। হুমায়ূন আহমেদের বড় উপন্যাসগুলোর তুলনায় আকারে ছোট হলেও, রহস্য নির্মাণ, মনস্তাত্ত্বিক আবহ এবং শেষ পর্যন্ত পাঠকের কৌতূহল ধরে রাখার ক্ষমতার কারণে ‘বৃহন্নলা’ তাঁর অতিপ্রাকৃত ও মিসির আলি-সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন।