বিপদ

হুমায়ূন আহমেদ

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘বিপদ’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

হুমায়ূন আহমেদের ‘বিপদ’ মিসির আলি সিরিজের সপ্তম গ্রন্থ। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত এই অপেক্ষাকৃত ছোট উপন্যাসটি সিরিজের প্রচলিত রহস্যকাহিনির তুলনায় বেশ আলাদা। এর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন কোন খুন, অপরাধ বা প্রচলিত ভূতের রহস্য নয়; বরং একজন মানুষের হঠাৎ করে বিড়ালের ভাষা বুঝতে পারার অভিজ্ঞতা এবং সেই অভিজ্ঞতা তার স্বাভাবিক জীবন ও মানসিক জগতকে কীভাবে বিপর্যস্ত করে।

কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র আফসার সাহেব। তিনি অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ—হাসি-ঠাট্টা তাঁর স্বভাবের অংশ নয়। স্ত্রী মীরা ও দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর স্বাভাবিক সংসার। কিন্তু হঠাৎ তাঁর জীবনে এমন একটি অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা ঘটে, যা তাঁর পরিচিত পৃথিবীর ধারণাকেই পাল্টে দেয়। তিনি বিড়ালের কথা বুঝতে শুরু করেন। প্রথমে ঘটনাটি বিস্ময়কর মনে হলেও খুব দ্রুত সেটি আনন্দের পরিবর্তে মানসিক চাপ ও অস্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে।

হুমায়ূন আহমেদের কৃতিত্ব হল, তিনি এই অদ্ভুত ধারণাটিকে নিছক হাসির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেননি। একজন মানুষ যদি সত্যিই অন্য একটি প্রাণীর ভাষা বুঝতে পারে, তাহলে তার জন্য বিষয়টি আশীর্বাদ হবে, নাকি অভিশাপ—‘বিপদ’ মূলত এই প্রশ্নটি অনুসরণ করে। মানুষের পৃথিবী যেমন তার নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হয়, তেমনি প্রাণীদেরও রয়েছে আলাদা জগৎ, আচরণ ও যোগাযোগব্যবস্থা। সেই জগতের দরজা হঠাৎ মানুষের সামনে খুলে গেলে পরিচিত বাস্তবতাই অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

এখানে শিরোনাম ‘বিপদ’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত কোন বিশেষ ক্ষমতাকে আমরা অর্জন বা সৌভাগ্য হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ দেখান, প্রত্যাশার বাইরে কোন ক্ষমতা মানুষের ওপর চাপিয়ে দিলে সেটিই বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। আফসার সাহেবের সমস্যাটি কেবল তিনি বিড়ালের কথা বুঝতে পারছেন—এটুকু নয়; বরং তিনি এমন একটি বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন, যার সঙ্গে তাঁর সামাজিক ও পারিবারিক জীবন খাপ খাওয়াতে পারছে না।

এই জায়গায় মিসির আলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রচলিত অর্থে গোয়েন্দা নন; অস্বাভাবিক ঘটনাকে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝাই তাঁর পদ্ধতি। ‘বিপদ’-এও তিনি ঘটনাটিকে সরলভাবে অলৌকিক বলে গ্রহণ করেন না। কিন্তু এই উপন্যাসের বিশেষত্ব হল—মিসির আলি রহস্যের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হাজির করলেও পুরো ঘটনাকে সম্পূর্ণভাবে নিজের যুক্তির আওতায় আনতে পারেন না। লেখকের ভূমিকাতেও এই সীমার কথা স্পষ্টভাবে এসেছে: প্রকৃতি কখনো একটি রহস্যের পর্দা সরালেও তার পরেই আরও গভীর রহস্য তৈরি করতে পারে।

এই দিক থেকে ‘বিপদ’ মিসির আলি সিরিজের যুক্তিবাদী দর্শনের একটি আকর্ষণীয় পরীক্ষা। মিসির আলি এখানে সব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তরদাতা নন; বরং তিনি এমন একজন অনুসন্ধানী মানুষ, যিনি জানেন—কোন রহস্যের ব্যাখ্যা পাওয়া আর রহস্যের প্রকৃত স্বরূপ সম্পূর্ণভাবে জানা এক কথা নয়। ফলে উপন্যাসটি পাঠককে যুক্তিবাদী হওয়ার পাশাপাশি নিজের জ্ঞানের সীমা সম্পর্কেও সচেতন করে।

উপন্যাসটির আরেকটি শক্তি হাস্যরস। আফসার সাহেবের জন্মগত গাম্ভীর্য এবং তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে যে বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে, তা থেকেই অনেক হাস্যরস জন্ম নেয়। বিড়ালদের আচরণ ও তাদের কথাবার্তার কল্পনাও গল্পটিকে হালকা করেছে। তবে এই হাস্যরসের আড়ালে এক ধরনের নিঃসঙ্গতা আছে—মানুষ অন্য প্রাণীর কথা বুঝতে পারছে, অথচ নিজের চারপাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। পাঠকদের আলোচনাতেও বইটির হাস্যরসের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক দিকটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

তবে ‘বিপদ’ মিসির আলি সিরিজের সব পাঠকের কাছে সমানভাবে সন্তোষজনক নাও হতে পারে। যারা মিসির আলির গল্পে জটিল রহস্য, শক্তিশালী তদন্ত এবং শেষদিকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট সমাধান প্রত্যাশা করেন, তাদের কাছে এর সমাপ্তি কিছুটা অসম্পূর্ণ বা দুর্বল মনে হতে পারে। পাঠক-প্রতিক্রিয়ায়ও একদিকে গল্পের গতি ও মনস্তাত্ত্বিক সম্ভাবনার প্রশংসা আছে, অন্যদিকে অলৌকিক ঘটনার ব্যাখ্যাকে তুলনামূলকভাবে দুর্বল মনে করার মতও পাওয়া যায়।

তবু ‘বিপদে’র সাহিত্যিক মূল্য এখানেই যে, এটি মিসির আলিকে কেবল রহস্য সমাধানকারী চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করে না। একটি অদ্ভুত কল্পনাকে কেন্দ্র করে হুমায়ূন আহমেদ মানুষের স্বাভাবিকতার ধারণা, যোগাযোগের সীমা, মানসিক ভারসাম্য এবং অজানাকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে খেলেছেন। মিসির আলির যুক্তি এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেই প্রশ্ন—সবকিছুর ব্যাখ্যা কি মানুষের হাতে থাকা সম্ভব?

মিসির আলি সিরিজের ধারাবাহিকতায় ‘বিপদ’ তাই একটি ব্যতিক্রমী রচনা। ‘দেবী’র মতো তীব্র মনস্তাত্ত্বিক রহস্য কিংবা ‘নিশীথিনী’র মতো অতিপ্রাকৃত আবহের বদলে এখানে হুমায়ূন আহমেদ অদ্ভুত কল্পনা, হাস্যরস ও মনস্তত্ত্বকে একত্র করেছেন। ছোট পরিসর, দ্রুতগামী বর্ণনা এবং অস্বাভাবিক একটি ধারণাকে কেন্দ্র করে গল্প নির্মাণের দক্ষতার কারণে বইটি সহজপাঠ্য; কিন্তু তার ভেতরের প্রশ্নগুলো একেবারে সরল নয়। ‘বিপদ’ শেষ পর্যন্ত রহস্যের চেয়ে মানুষের উপলব্ধির সীমা নিয়ে বেশি কৌতূহলী একটি মিসির আলি-রচনা।