ভয়

হুমায়ূন আহমেদ

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘ভয়’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

হুমায়ূন আহমেদের ‘ভয়’ গ্রন্থে মিসির আলিকে কেন্দ্র করে তিনটি গল্প—‘চোখ’, ‘জিন-কফিল’ ও ‘সঙ্গিনী’—সংকলিত হয়েছে। তিনটি গল্পেরই ভিত্তিতে আছে অস্বাভাবিক বা ব্যাখ্যাতীত অভিজ্ঞতা; কিন্তু তিনটির নির্মাণভঙ্গি এক নয়। প্রথম দুটি গল্পে অতিপ্রাকৃত বলে মনে হওয়া ঘটনার পেছনে যুক্তিসংগত বাস্তবতা অনুসন্ধানের প্রবণতা প্রবল, আর ‘সঙ্গিনী’ তুলনামূলকভাবে রহস্য ও অনির্ণেয়তার জায়গায় বেশি দাঁড়িয়ে আছে।

‘চোখ’ গল্পটি তিনটির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে মিসির আলির যুক্তিবাদী সত্তাকে সামনে আনে। রাশেদুল করিম নামের একজন ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে ঘিরে এক অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার কথা নিয়ে মিসির আলির কাছে আসেন। স্ত্রী মারা গেছেন; তাঁর রেখে যাওয়া ডায়েরি এবং রাশেদুলের নিজের বয়ান—এই দুই সূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে মিসির আলি ঘটনাটিকে বিশ্লেষণ করেন।

গল্পটির সাফল্য মূলত রহস্যের চেয়ে রহস্য তৈরির কৌশলে। পাঠক প্রথমে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যার স্বাভাবিক ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। কিন্তু মিসির আলি কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তথ্যগুলোকে আলাদা করেন, মানুষের বক্তব্যের অসঙ্গতি লক্ষ করেন এবং ঘটনাগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দিক বিবেচনা করেন। ফলে ‘চোখ’ নিছক ভৌতিক গল্প হয়ে ওঠে না; এটি মানুষের উপলব্ধি, স্মৃতি এবং মানসিক অবস্থার ওপরও একটি সূক্ষ্ম অনুসন্ধান।

গল্পটির আরেকটি আকর্ষণ হল চোখের প্রতীকী ব্যবহার। চোখ সাধারণত সত্য দেখার মাধ্যম; কিন্তু এই গল্পে দেখা এবং সত্য জানা এক জিনিস নয়। মানুষ যা দেখে, তার ব্যাখ্যা সবসময় সত্যের সঙ্গে মেলে না। এই দ্বন্দ্বই গল্পটির রহস্যকে গভীর করে।

‘জিন-কফিল’ আরও গাঢ় ও অস্বস্তিকর আবহের গল্প। এখানে একটি পরিবারের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে ‘কফিল’ নামের এক জিনের উপস্থিতির ধারণা যুক্ত হয়। গল্পের বর্ণনায় দেখা যায়, ভয় ও বিশ্বাস কীভাবে মানুষের অভিজ্ঞতাকে একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার দিকে পরিচালিত করতে পারে।

এই গল্পে হুমায়ূন আহমেদের বিশেষ দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে লোকবিশ্বাস ও মনস্তত্ত্বকে পাশাপাশি রাখার ক্ষেত্রে। পাঠকের সামনে প্রথমে অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যাটিই প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু মিসির আলির অনুসন্ধান সেই বিশ্বাসকে প্রশ্ন করে। তিনি অলৌকিক ব্যাখ্যাকে সরাসরি গ্রহণ করেন না; বরং মানুষের আচরণ, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং মানসিক অবস্থার মধ্য থেকে ঘটনার সম্ভাব্য কারণ খুঁজে দেখেন।

‘জিন-কফিল’-এর ভয় তাই কেবল জিনের ভয় নয়। এর গভীরে আছে মানুষের ভয়, অপরাধবোধ, মানসিক চাপ এবং কোন একটি বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা। এই কারণে গল্পটির ভৌতিক আবহের চেয়েও মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাঠকদের মধ্যেও গল্পটির এই অন্ধকার ও তীব্র আবহ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

তবে গল্পটির যুক্তিনির্ভর সমাধান নিয়ে পাঠকদের মধ্যে কিছু আপত্তিও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেছেন, শেষের ব্যাখ্যা কিছু জায়গায় অতিরিক্ত সরলীকৃত। এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিলেও গল্পটি ভয় সৃষ্টি এবং রহস্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে বেশ সফল।

‘সঙ্গিনী’ তিনটির মধ্যে সবচেয়ে আলাদা। এখানে রহস্যের কেন্দ্র কোন জিন, অস্বাভাবিক শারীরিক ঘটনা কিংবা মৃত্যুর অনুসন্ধান নয়; বরং স্বপ্ন। লোকমান ফকির নামের এক ব্যক্তি বারবার এমন একটি স্বপ্ন দেখেন, যেখানে তিনি একটি মেয়ের সঙ্গে ছুটে চলেন। ঘুম ভাঙার পর স্বপ্নের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাস্তব শরীরে অদ্ভুত চিহ্নের সম্পর্কও দেখা যায়। মিসির আলির কাছে এই অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই একটি সমস্যার রূপ নেয়।

‘সঙ্গিনী’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল, এখানে রহস্যের সমাধানের চেয়ে রহস্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মিসির আলি সমস্যাটির একটি বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ দেখান। কিন্তু লোকমান সেই সমাধান মেনে নিতে চান না। কারণ তাঁর কাছে স্বপ্নের সেই অদৃশ্য সঙ্গিনী কেবল একটি ভয়ংকর অভিজ্ঞতা নয়; তার মধ্যে এক ধরনের আকর্ষণও তৈরি হয়েছে।

এই জায়গাটিতেই গল্পটি মিসির আলির যুক্তিবাদী জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা নির্দেশ করে। যুক্তি দিয়ে কোন অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হলেও মানুষের অনুভূতি সবসময় যুক্তির নির্দেশ মেনে চলে না। মানুষ কখনো কখনো এমন একটি জগতকেই আঁকড়ে ধরে, যেটিকে বাস্তবতার বিচারে পরিত্যাগ করা উচিত। ‘সঙ্গিনী’র সৌন্দর্য এখানেই।

তিনটি গল্প পাশাপাশি পড়লে হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি-ভাবনার একটি চমৎকার ছবি পাওয়া যায়। ‘চোখ’ বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যকে অনুসন্ধান করে, ‘জিন-কফিল’ লোকবিশ্বাস ও মনস্তত্ত্বের সংঘাতকে সামনে আনে, আর ‘সঙ্গিনী’ মানুষের স্বপ্ন ও অনুভূতির এমন এক অঞ্চলে প্রবেশ করে যেখানে যুক্তির ক্ষমতা সীমিত। এই বৈচিত্র্যই ‘ভয়’কে কেবল একটি ভৌতিক গল্পগ্রন্থ না বানিয়ে মনস্তাত্ত্বিক রহস্যের একটি উল্লেখযোগ্য সংকলনে পরিণত করেছে। বইটি মিসির আলি সিরিজের ষষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে পরিচিত এবং এর তিনটি গল্পই মিসির আলিকে কেন্দ্র করে নির্মিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, হুমায়ূন আহমেদ এখানে পাঠককে শুধু ভয় দেখাতে চাননি; তিনি ভয়ের কারণ খুঁজতে চেয়েছেন। অজানাকে আমরা কেন ভয় পাই? কোন অস্বাভাবিক ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে কেন অলৌকিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করি? মানুষের মন কীভাবে নিজের ভয়কে বাস্তবতার রূপ দেয়? আর কোন রহস্যের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও কেন কখনো কখনো মানুষ রহস্যটিকেই ভালবেসে ফেলে? ‘চোখ’, ‘জিন-কফিল’ ও ‘সঙ্গিনী’—তিনটি গল্প ভিন্ন ভিন্ন পথে এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করায় পাঠককে। এ কারণেই ‘ভয়’ মিসির আলি-সাহিত্যের একটি স্মরণযোগ্য সঙ্কলন।

ভয় ❀ এডুলিচার পাঠশালা | এডুলিচার