বঙ্কিমের পত্রাবলী

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

এই পৃষ্ঠাটি মূল পত্রগুলোর পরিচিতি ও সঙ্কলন; এটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কোনো একক পত্রের মূল পাঠ নয়।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবন সম্পর্কে জানতে তাঁর উপন্যাস, প্রবন্ধ ও অন্যান্য গ্রন্থের পাশাপাশি তাঁর পত্রাবলিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যিক বঙ্কিমকে আমরা তাঁর প্রকাশিত রচনার মধ্য দিয়ে যতটা চিনি, তাঁর ব্যক্তিমানস, সমকালীন সম্পর্ক, সাহিত্যচর্চার অন্তরঙ্গ পরিবেশ এবং চিন্তার বিবর্তন সম্পর্কে আরও কিছুটা জানা যায় তাঁর লেখা চিঠিপত্রের মধ্য দিয়ে। এই অর্থে বঙ্কিমের পত্রাবলী তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি মূল্যবান পরিপূরক দলিল।

বঙ্কিমচন্দ্রের পত্রে একদিকে যেমন ব্যক্তিগত জীবনের নানা প্রসঙ্গ, পারিবারিক বিষয়, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের সঙ্গে যোগাযোগের পরিচয় পাওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি সমকালীন সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কেও তাঁর মনোভাবের নানা আভাস মেলে। কোনো কোনো পত্রে প্রকাশ পেয়েছে সাহিত্যিক পরিকল্পনা, লেখালেখির প্রসঙ্গ কিংবা কোনো রচনা সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব মত; আবার কোথাও ফুটে উঠেছে সমকালীন ব্যক্তি ও ঘটনাবলি সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ। ফলে পত্রগুলো কেবল ব্যক্তিগত যোগাযোগের দলিল হয়ে থাকে না—বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতার ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হয়ে ওঠে।

একজন সাহিত্যিকের পত্রাবলির বিশেষ মূল্য হলো তার অনানুষ্ঠানিকতা। প্রকাশিত প্রবন্ধ বা গ্রন্থে লেখক সাধারণত সুপরিকল্পিত ও পরিশীলিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন; চিঠিতে সেই বাধ্যবাধকতা অনেক কম। ফলে পত্রের ভাষা ও বক্তব্যে ব্যক্তিমানসের অপেক্ষাকৃত স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ ঘটতে পারে। বঙ্কিমচন্দ্রের ক্ষেত্রেও তাঁর পত্রাবলি তাঁর ব্যক্তিত্বের এমন কিছু দিকের সন্ধান দেয়, যা তাঁর সাহিত্যকর্মের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে সবসময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে না।

বঙ্কিমচন্দ্র উনিশ শতকের বাংলা নবজাগরণের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তাঁর কর্মজীবন, সাহিত্যচর্চা এবং সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই সময়ের সাহিত্যিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে তাঁর অবস্থান, বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং নানা বিষয় নিয়ে তাঁর ভাবনার পরিবর্তন ও বিকাশ বুঝতে পত্রাবলি বিশেষ সহায়ক। এ কারণে বঙ্কিমের চিঠিপত্র সাহিত্য-ইতিহাসের পাশাপাশি উনিশ শতকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও মূল্যবান উৎস।

তবে পত্রাবলির পাঠে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—চিঠি মূলত নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে লেখা ব্যক্তিগত দলিল। তাই বিচ্ছিন্ন কোনো বক্তব্যকে বঙ্কিমচন্দ্রের সর্বজনীন বা চূড়ান্ত মত হিসেবে গ্রহণ করা সবসময় সমীচীন নয়। পত্রের তারিখ, প্রাপক, পারিপার্শ্বিক ঘটনা এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের অন্যান্য রচনার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করলেই তার বক্তব্যের প্রকৃত তাৎপর্য যথাযথভাবে বোঝা সম্ভব।

বঙ্কিমের পত্রাবলী তাই নিছক চিঠির সংকলন নয়; এটি বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যক্তি ও সাহিত্যিক সত্তাকে কাছ থেকে দেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা। তাঁর সৃষ্টির অন্তরালে থাকা মানুষটি, তাঁর সমকাল, সম্পর্ক, চিন্তা এবং সাহিত্যিক কর্মপরিকল্পনার নানা বিচ্ছিন্ন সূত্র এই পত্রগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে আছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস ও বঙ্কিমচন্দ্রের জীবন-সাহিত্য নিয়ে আগ্রহী পাঠকের কাছে এই পত্রাবলি সেই সূত্রগুলোকে একত্রে পাঠ করার একটি মূল্যবান সুযোগ সৃষ্টি করে।