বাবরনামা

জহির উদ্দীন বাবর

অনুবাদ: মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সম্রাট জহির উদ্-দিন মুহম্মদ বাবর রচিত ‘বাবরনামা’-এর বাংলা অনুবাদ, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক-ঐতিহাসিক পরিচিতি।

মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাস অনূদিত ‘বাবরনামা’ মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবরের জীবন, অভিজ্ঞতা, যুদ্ধ, রাজনীতি, ভ্রমণ, প্রকৃতি, মানুষ ও সমকালীন সমাজের এক অসাধারণ প্রত্যক্ষ দলিল। ইতিহাসের প্রচলিত রাজা-বাদশাহকেন্দ্রিক বর্ণনার বাইরে ‘বাবরনামা’র বিশেষত্ব হলো—এখানে একজন সম্রাট নিজেই নিজের জীবন ও সময়কে লিপিবদ্ধ করেছেন। ফলে এটি একই সঙ্গে আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা, রাজনৈতিক ইতিহাস, ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং মধ্যযুগীয় মধ্য এশিয়া ও ভারতবর্ষের একটি মূল্যবান সাংস্কৃতিক দলিল।

বাবর ছিলেন তৈমুর ও চেঙ্গিস খানের বংশধর। ১৪৮৩ খ্রিষ্টাব্দে আন্দিজানে জন্ম নেওয়া এই রাজপুত্র মাত্র বারো বছর বয়সে ফারগানার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর পরবর্তী জীবন ছিল ক্ষমতা রক্ষা ও হারানোর, নতুন ভূখণ্ড জয়ের এবং বারবার নতুন করে রাজনৈতিক ভিত্তি নির্মাণের এক দীর্ঘ সংগ্রাম। সমরখন্দ দখলের আকাঙ্ক্ষা, মধ্য এশিয়ার রাজনৈতিক সংঘাত, শায়বানিদের উত্থান এবং শেষ পর্যন্ত কাবুলে তাঁর শক্ত ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা—সবকিছুর প্রত্যক্ষ বিবরণ ‘বাবরনামা’র পাতায় ছড়িয়ে আছে।

ভারতবর্ষে বাবরের আগমন এবং দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে ১৫২৬ সালের পানিপথের যুদ্ধে বিজয় তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর খানওয়া, চান্দেরি ও ঘাঘরার যুদ্ধের মধ্য দিয়ে উত্তর ভারতে তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুদৃঢ় হয়। কিন্তু ‘বাবরনামা’র গুরুত্ব কেবল এই যুদ্ধগুলোর বিবরণে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধের পাশাপাশি বাবর লিখেছেন তাঁর ব্যক্তিগত আনন্দ-বেদনা, বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, ভ্রমণ, খাদ্য, পোশাক, উদ্ভিদ, ফলমূল, নদী-পাহাড়, নগর ও মানুষের স্বভাব সম্পর্কে। ফলে গ্রন্থটি একই সঙ্গে বৃহৎ রাজনৈতিক ইতিহাস এবং দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্র অথচ মূল্যবান বিবরণের আধার হয়ে উঠেছে।

‘বাবরনামা’র আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য এর আত্মস্বীকারমূলক স্বর। বাবর নিজেকে সর্বদা নিখুঁত বিজয়ী বা মহিমান্বিত সম্রাট হিসেবে উপস্থাপন করেননি। তাঁর পরাজয়, হতাশা, রাজনৈতিক ভুল, ব্যক্তিগত দুর্বলতা, আকাঙ্ক্ষা ও অনুশোচনাও তাঁর বর্ণনায় স্থান পেয়েছে। এই আত্মপ্রত্যয়ী অথচ আত্মসমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রন্থটিকে সাধারণ রাজদরবারি ইতিহাস থেকে পৃথক করেছে। একজন শাসক নিজের সময়কে কীভাবে দেখতেন এবং নিজের জীবনকে কীভাবে বিচার করতেন—‘বাবরনামা’ তার এক বিরল উদাহরণ।

গ্রন্থটির প্রকৃতিগত বৈচিত্র্যও বিস্ময়কর। মধ্য এশিয়ার তুর্কি ভূগোল থেকে শুরু করে আফগানিস্তান ও উত্তর ভারতের প্রকৃতি, জলবায়ু, ফলমূল ও উদ্ভিদ সম্পর্কে বাবরের পর্যবেক্ষণ তাঁর গভীর অনুসন্ধিৎসু মনকে প্রকাশ করে। ভারতবর্ষ সম্পর্কে তাঁর কিছু মন্তব্যে বিস্ময়, মুগ্ধতা, আবার কোথাও অসন্তোষও রয়েছে। নতুন ভূখণ্ডকে একজন মধ্য এশীয় শাসকের চোখে দেখার সুযোগ ‘বাবরনামা’কে ইতিহাসের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ ও সংস্কৃতি-দলিলেও পরিণত করেছে।

তবে ‘বাবরনামা’কে নিছক নিরপেক্ষ ইতিহাস হিসেবে পড়া উচিত নয়। এটি একজন সম্রাটের নিজের হাতে লেখা আত্মজীবনী; ফলে এর মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক রুচি ও মূল্যবোধ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে। কোনো ঘটনা বা ব্যক্তি সম্পর্কে বাবরের মূল্যায়ন তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে নির্মিত। তাই গ্রন্থটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম হলেও এর বক্তব্যকে অন্যান্য সমকালীন ও পরবর্তী উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে ইতিহাসের আরও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়।

মুহম্মদ জালালউদ্দীন বিশ্বাসের বাংলা অনুবাদের বিশেষ গুরুত্ব এখানেই যে, ‘বাবরনামা’র মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক আত্মজীবনী বাংলা পাঠকের কাছে সহজলভ্য হয়। মধ্যযুগীয় তুর্কি ভাষায় রচিত মূল গ্রন্থের ভাষা, ঐতিহাসিক পরিভাষা, স্থাননাম ও ব্যক্তিনামের যথাযথ অর্থ বাংলা ভাষায় তুলে ধরা অনুবাদকের জন্য সহজ কাজ নয়। একটি ভালো অনুবাদকে একই সঙ্গে মূলের বক্তব্যের বিশ্বস্ততা, ঐতিহাসিক পরিভাষার নির্ভুলতা এবং বাংলা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হয়। জালালউদ্দীন বিশ্বাসের অনুবাদ সেই বৃহৎ ঐতিহাসিক দলিলকে বাংলা পাঠপরিসরে নিয়ে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

‘বাবরনামা’ পড়লে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের পাশাপাশি ষোড়শ শতকের সূচনালগ্নের বৃহত্তর এশীয় রাজনৈতিক জগতেরও পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে সমরখন্দ, কাবুল ও দিল্লি বিচ্ছিন্ন কোনো ভূখণ্ড নয়; যুদ্ধ, বংশপরম্পরা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সূত্রে তারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। বাবরের জীবন তাই কেবল একটি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার কাহিনি নয়—এটি মধ্য এশিয়া থেকে ভারতবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত এক পরিবর্তনশীল সময়ের ইতিহাস।

বাংলা ভাষায় ‘বাবরনামা’র এই অনুবাদ সেই কারণে কেবল ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য নয়, মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষ, মুঘল ইতিহাস, আত্মজীবনীমূলক সাহিত্য, সাম্রাজ্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী প্রত্যেক পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিজেতার জীবনকাহিনির আড়ালে এখানে যে মানুষটিকে দেখা যায়—যিনি কখনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী শাসক, কখনো পরাজিত রাজপুত্র, কখনো প্রকৃতিপ্রেমী পর্যবেক্ষক, কখনো স্মৃতিকাতর মানুষ—তাঁর বহুমাত্রিক উপস্থিতিই ‘বাবরনামা’র সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক আকর্ষণ। এই কারণেই কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে এসেও গ্রন্থটি ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল হিসেবে তার গুরুত্ব অক্ষুণ্ণ রেখেছে।