অন্যভুবন

হুমায়ূন আহমেদ

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হুমায়ূন আহমেদ রচিত ‘অন্যভুবন’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

হুমায়ূন আহমেদের ‘অন্যভুবন’ মিসির আলি সিরিজের একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস, যেখানে রহস্য, মনস্তত্ত্ব, পরাবাস্তবতা এবং কল্পবিজ্ঞানের উপাদান পরস্পরের সঙ্গে মিশে একটি অস্বাভাবিক জগতের ধারণা তৈরি করেছে। বইটি মিসির আলি সিরিজের চতুর্থ রচনা হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সংস্করণগুলোর প্রকাশনা-তথ্যেও একে মিসির আলি সিরিজের বই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে নয় বছরের শিশু তিন্নি। তার বাবা বরকতউল্লাহ মেয়েকে নিয়ে মিসির আলির কাছে আসেন। তিন্নির জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি অস্বাভাবিক ঘটনা—তার মা সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় এমন একটি কথা বলেছিলেন, যার মধ্যে ভবিষ্যৎ সন্তানের পরিচয় নিয়েই এক অদ্ভুত ইঙ্গিত ছিল। পরবর্তীকালে দেখা যায়, তিন্নির আচরণও সাধারণ শিশুর মতো নয়। সে গাছের সঙ্গে এক ধরনের যোগাযোগ অনুভব করতে পারে এবং মানুষের মনের কথাও বুঝতে পারে বলে মনে হয়। ফলে প্রশ্নটি ক্রমে দাঁড়ায়: তিন্নি কি কেবল অসাধারণ মানসিক ক্ষমতার অধিকারী একটি শিশু, নাকি তার অস্তিত্বের সঙ্গে পরিচিত মানবজগতের বাইরের কোনো বাস্তবতার সম্পর্ক রয়েছে?

এই প্রশ্নের অনুসন্ধানেই মিসির আলির প্রবেশ। ‘দেবী’তে যেমন তিনি অস্বাভাবিক ঘটনাকে যুক্তির কাঠামোর মধ্যে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন, ‘অন্যভুবনে’ও তাঁর প্রাথমিক অবস্থান একই—কোনো ঘটনা অস্বাভাবিক হলেই সেটিকে অলৌকিক বলে মেনে নেওয়া যাবে না। কিন্তু এই উপন্যাসের বিশেষত্ব হলো, মিসির আলির অনুসন্ধান তাঁকে এমন এক অঞ্চলে নিয়ে যায় যেখানে যুক্তির পরিচিত কাঠামোই ক্রমে অপ্রতুল বলে মনে হতে থাকে। পাঠক-আলোচনাতেও মিসির আলির মতো যুক্তিবাদী চরিত্রের পরাবাস্তবতার জগতে প্রবেশকে উপন্যাসটির অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

‘অন্যভুবনে’র সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক সম্ভবত মানুষের পরিচয় ও অস্তিত্বের প্রশ্ন। তিন্নিকে ঘিরে ‘মানুষ না অন্য কিছু’—এই প্রশ্নটি কেবল রহস্য সৃষ্টির কৌশল নয়; এর মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ মানুষের পরিচয়কে জৈবিক ও মানসিক দুই দিক থেকেই ভাবার সুযোগ তৈরি করেছেন। গাছের সঙ্গে তিন্নির সম্পর্কের ধারণাটি তাই নিছক কল্পনাপ্রসূত চমক নয়; এটি মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ককেও একটি অস্বাভাবিক, কল্পনাময় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। এখানে পরামনোবিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানের উপাদানও লক্ষণীয়। মানুষের মনের কথা জানা, প্রচলিত ইন্দ্রিয়ের বাইরে কোনো কিছুর উপলব্ধি এবং বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা—এসব বিষয় কাহিনিকে সাধারণ রহস্যোপন্যাসের চেয়ে আলাদা করে। তবে ‘অন্যভুবন’কে কঠোর অর্থে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বলা ঠিক হবে না। হুমায়ূন আহমেদ এখানে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব ও কল্পনার সীমান্তে দাঁড়িয়ে একটি সাহিত্যিক সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। বইটির প্রকাশনা-পরিচিতিতেও একে রহস্যের পাশাপাশি বিজ্ঞানকল্পের উপাদানসমৃদ্ধ রচনা হিসেবে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে।

উপন্যাসটির আরেকটি শক্তি মিসির আলির চরিত্রায়ণ। তিনি প্রচলিত অর্থে গোয়েন্দা নন। তাঁর অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য অপরাধী শনাক্ত করা নয়; বরং ঘটনার প্রকৃতি বোঝা। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, প্রশ্ন করেন, মানুষের আচরণ বিশ্লেষণ করেন এবং সম্ভাব্য ব্যাখ্যাগুলো যাচাই করেন। কিন্তু ‘অন্যভুবনে’ তাঁর যুক্তিবাদী মানসিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। পরিচিত বাস্তবতার বাইরে কোনো সম্ভাবনাকে একেবারে অস্বীকার করা যেমন যুক্তিবাদ নয়, তেমনি প্রমাণ ছাড়াই তাকে সত্য বলে মেনে নেওয়াও যুক্তিবাদ নয়—মিসির আলির অবস্থান এই সূক্ষ্ম সীমারেখাটিকে সামনে নিয়ে আসে।

হুমায়ূন আহমেদের লেখার স্বাভাবিক সরলতা ও সংলাপনির্ভরতা এই জটিল ধারণাগুলোকেও সহজপাঠ্য করে তুলেছে। তিনি দীর্ঘ দার্শনিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে ছোট ছোট ঘটনা, চরিত্রের আচরণ এবং কথোপকথনের মধ্য দিয়ে রহস্য তৈরি করেছেন। ফলে বইটি যেমন দ্রুতপাঠ্য, তেমনি পাঠ শেষে এর মূল প্রশ্নগুলো সহজে মাথা থেকে সরে যায় না। মিসির আলি সিরিজের বইগুলোর মতো এখানেও রহস্যের পাশাপাশি চরিত্রের মনোজগতই কাহিনির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।

তবে ‘অন্যভুবনে’র কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। উপন্যাসের ধারণাটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় হলেও এর কিছু রহস্যের ব্যাখ্যা পাঠকের কাছে সম্পূর্ণ সন্তোষজনক নাও হতে পারে। বিশেষ করে যে পাঠক মিসির আলির গল্পে কঠোর যুক্তিনির্ভর সমাধান প্রত্যাশা করেন, তাঁর কাছে উপন্যাসের পরাবাস্তব পরিণতি কিছুটা অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে। পাঠক-প্রতিক্রিয়াতেও এই দ্বৈততা দেখা যায়—অনেকে এর রহস্যময়তা ও কল্পনাশক্তির প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ কেউ মনে করেছেন কিছু উপকাহিনি মূল রহস্যকে কিছুটা ছড়িয়ে দিয়েছে।

তবু ‘অন্যভুবনে’র মূল্য ঠিক এখানেই যে এটি পাঠককে একটি নির্দিষ্ট উত্তর দিয়ে থামিয়ে দেয় না। আমরা যাকে বাস্তবতা বলি, তার সীমানা কোথায়? মানুষের চেতনার ক্ষমতা কতদূর? প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক কি আমাদের প্রচলিত ধারণার চেয়েও গভীর? আর কোনো অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতাকে আমরা মানসিক ব্যাখ্যা দেব, নাকি তার মধ্যে অজানা কোনো বাস্তবতার সম্ভাবনা খুঁজব?—উপন্যাসটি এসব প্রশ্ন উত্থাপন করে।

সব মিলিয়ে ‘অন্যভুবন’ মিসির আলি সিরিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, কারণ এখানে রহস্যের পরিধি ব্যক্তিমানুষের মন থেকে প্রসারিত হয়ে বাস্তবতার প্রকৃতি ও মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্নে পৌঁছেছে। তিন্নির রহস্য এবং মিসির আলির যুক্তিবাদী অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এমন একটি জগতের দরজা খুলেছেন, যার নামই যেন যথার্থভাবে ‘অন্যভুবন’—আমাদের পরিচিত পৃথিবীর খুব কাছাকাছি থেকেও যার নিয়মকানুন সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।