এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ রচিত ‘অলীক মানুষ’ উপন্যাসের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।
প্রকাশক : সুভাষচন্দ্র দে।
দে’জ পাবলিশিং ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০৭৩
প্রচ্ছদ : গৌতম রায়।
লেজার টাইপ সেটিং : পেজমেকার্স ২৩বি রাসবিহারী এভিনিউ, কলকাতা ৭০০০২৬
মুদ্ৰক : স্বপনকুমার দে। দে’জ অফসেট ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০৭৩
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘অলীক মানুষ’ বাংলা কথাসাহিত্যের এমন একটি উপন্যাস, যেখানে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, ধর্মীয় সংস্কার, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব একসঙ্গে এসে এক বিস্ময়কর আখ্যানের জন্ম দিয়েছে। উনিশ ও বিশ শতকের সন্ধিক্ষণকে পটভূমি করে গড়ে ওঠা এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে এক মুসলিম পীরপরিবার এবং তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা মানুষের বিশ্বাস, ভয়, বিস্ময় ও কিংবদন্তি। ফলে ‘অলীক মানুষ’ কেবল কোনো একটি পরিবারের কাহিনি হয়ে থাকে না; ধীরে ধীরে তা হয়ে ওঠে একটি সময়, একটি সমাজ এবং মানুষের বিশ্বাসের বিবর্তনের বহুমাত্রিক দলিল।
উপন্যাসটির অন্যতম বড় শক্তি তার কাহিনি নির্মাণের ভঙ্গিতে। সরলরৈখিক বর্ণনার বদলে সিরাজ কখনও ইতিহাসের ভাষা, কখনও মিথ ও কিংবদন্তি, কখনও ব্যক্তিগত স্মৃতি বা ডায়েরির উপাদান, আবার কখনও বিচ্ছিন্ন নথির মতো আখ্যানকে এগিয়ে নিয়েছেন। এই কোলাজধর্মী নির্মাণশৈলী দূরবর্তী এক সময়কে যেন বহু বিচ্ছিন্ন আয়নায় প্রতিফলিত করে। পাঠক তাই শুধু একটি ঘটনা পড়েন না; বরং একই ঘটনার ভেতরে বিশ্বাস, স্মৃতি, কল্পনা ও বাস্তবতার নানা স্তরকে পাশাপাশি দেখতে পান।
‘অলীক মানুষ’-এর কেন্দ্রীয় ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষকে ঘিরে মিথ তৈরির প্রবণতা। রক্তমাংসের একজন মানুষ কীভাবে মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও কল্পনার আবরণে ক্রমশ একটি অতিমানবীয় সত্তায় পরিণত হয়—সিরাজ সেই রূপান্তরের মধ্যেই উপন্যাসের গভীর ট্র্যাজেডি খুঁজে পেয়েছেন। লেখকের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘অলীক মানুষ’ বলতে তিনি ‘মিথিক্যাল ম্যান’-কে বোঝাতে চেয়েছেন; অর্থাৎ মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মিথ একসময় তার প্রকৃত মানবিক সত্তাকেই আড়াল করে ফেলে।
এই কারণে উপন্যাসে লৌকিক ও অলৌকিকের সীমারেখা কখনও সুস্পষ্ট থাকে না। কোনো ঘটনা বিশ্বাসের চোখে অলৌকিক, আবার অন্য দৃষ্টিতে তা হতে পারে কেবল কাকতালীয় বা মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা। সিরাজ এই দ্বন্দ্বের কোনো সহজ মীমাংসা চাপিয়ে দেন না। বরং তিনি পাঠককে এমন এক মায়াময় অঞ্চলে নিয়ে যান, যেখানে বাস্তবতা ও কিংবদন্তি পরস্পরের মধ্যে মিশে যায় এবং সত্যের একমাত্রিক সংজ্ঞা ক্রমশ ভেঙে পড়ে। উপন্যাসের এই লৌকিক-অলৌকিক আবহই তার রহস্যময়তা ও সাহিত্যিক আকর্ষণকে আরও গভীর করে।
‘অলীক মানুষ’-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সামাজিক ও মানবিক পরিসর। পীরপরিবারের জীবনকে কেন্দ্র করে লেখক কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের চিত্র আঁকেননি; তার সঙ্গে যুক্ত করেছেন সাধারণ মানুষের জীবন, সামাজিক ক্ষমতার সম্পর্ক, সময়ের পরিবর্তন এবং বিশ্বাসের সঙ্গে ব্যক্তিসত্তার সংঘাত। ফলে এখানে ধর্ম নিছক একটি বিষয় নয়—মানুষের অস্তিত্ব, পরিচয়, আকাঙ্ক্ষা ও সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জটিল সামাজিক বাস্তবতা। এই মানবিক দৃষ্টিই উপন্যাসটিকে একপাক্ষিক ব্যঙ্গ বা ধর্মীয় কাহিনির সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর সাহিত্যিক পরিসরে নিয়ে গেছে।
সিরাজের ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গিতেও রয়েছে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য। মাটির কাছাকাছি মানুষের কথ্য অভিজ্ঞতা, লোকজ সংস্কৃতির স্বর, স্মৃতি ও কিংবদন্তির আবহ এবং মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা—সব মিলিয়ে তাঁর গদ্য কখনও সহজ, কখনও রহস্যময়, আবার কখনও গভীরভাবে দার্শনিক হয়ে ওঠে। এই বহুস্বরিক গদ্য উপন্যাসের সময় ও সমাজকে শুধু চোখের সামনে উপস্থিত করে না, তার অন্তর্লীন আবহটিকেও অনুভব করায়। ফলে ‘অলীক মানুষ’ পড়ার অভিজ্ঞতা একই সঙ্গে গল্পপাঠ, ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ এবং মানুষের বিশ্বাসের অন্তর্জগতে প্রবেশের অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
এই উপন্যাসের সাহিত্যিক গুরুত্বের একটি বড় প্রমাণ এর স্বীকৃতিও। ‘অলীক মানুষ’-এর জন্য সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ১৯৯৪ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর নিজের বক্তব্যেও এই উপন্যাসকে তিনি জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা ও ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে নির্মিত একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সব মিলিয়ে ‘অলীক মানুষ’ এমন একটি উপন্যাস, যার পাঠ কাহিনির শেষ পৃষ্ঠায় গিয়ে থেমে থাকে না। মানুষ কীভাবে মিথে পরিণত হয়, বিশ্বাস কীভাবে বাস্তবতাকে নতুন অর্থ দেয়, ইতিহাস কীভাবে ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে মিশে যায় এবং মানুষ নিজের নির্মিত কিংবদন্তির ভেতরেই কীভাবে হারিয়ে যেতে পারে—এই প্রশ্নগুলো উপন্যাসের পরত পেরিয়ে পাঠকের মনে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যায়। বাংলা সাহিত্যে লৌকিকতা, ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানবমনকে এমন বিস্তৃত ও অভিনব আখ্যানের মধ্যে একত্র করার দিক থেকে ‘অলীক মানুষ’ সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি।
উৎসর্গ
আব্দুর রউফ, প্রীতিভাজনেষু
Hatred is one of the passions that can master a life, and there is a temperament very prone to it, ready to see life in terins of vindictive melodrarna, ready to fine stimulus and satisfaction in frightful dem onstrations of ‘justice’ and ‘revenge’.
– H.G. wells