এই সঙ্কলনে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অগ্রন্থিত, পরিত্যক্ত ও অসম্পূর্ণ রচনাসমূহ সঙ্কলিত হয়েছে। অন্তর্ভুক্ত রচনাগুলোর সবকটিই লেখকের জীবদ্দশায় পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়নি।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন এক বিরল প্রতিভা, যাঁর রচনার মধ্য দিয়ে বাংলা গদ্য যেমন তার আধুনিক রূপ লাভ করেছে, তেমনি উপন্যাস, প্রবন্ধ, ইতিহাসচিন্তা, ধর্মতত্ত্ব ও সাহিত্যসমালোচনায়ও একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। তাঁর সুপরিচিত গ্রন্থসমূহের বাইরে ছড়িয়ে থাকা রচনাসম্ভারও সেই বৃহৎ সাহিত্যিক প্রতিভারই বিচিত্র ও মূল্যবান পরিচয় বহন করে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অথচ গ্রন্থভুক্ত হয়নি এমন রচনা, অসমাপ্ত বা পরিত্যক্ত রচনা, খসড়া, প্রাথমিক রূপ কিংবা লেখকের জীবদ্দশায় পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের মর্যাদা না-পাওয়া সাহিত্যকর্ম—সব মিলিয়ে বঙ্কিমের একটি অপেক্ষাকৃত অপ্রচলিত রচনাভুবন রয়েছে। এই সঙ্কলনের উদ্দেশ্য সেই ভুবনের নির্বাচিত রচনাগুলিকে একত্রে পাঠকের সামনে উপস্থিত করা।
একজন লেখকের পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যিক পরিচয় কেবল তাঁর স্বীকৃত ও সম্পূর্ণ গ্রন্থাবলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় তাঁর অসমাপ্ত রচনা তাঁর সৃষ্টিশীল প্রক্রিয়া সম্পর্কে এমন কিছু ইঙ্গিত দেয়, যা পরিণত রচনায় আর প্রত্যক্ষভাবে পাওয়া যায় না। কোথাও দেখা যায় একটি বিষয় নিয়ে তাঁর প্রাথমিক চিন্তা; কোথাও কোনো চরিত্র বা কাহিনির অসম্পূর্ণ বিকাশ; কোথাও আবার এমন একটি ভাবনার সূত্র, যা পরবর্তীকালে অন্য কোনো রচনায় পূর্ণতা লাভ করেছে। ফলে অগ্রন্থিত কিংবা অসম্পূর্ণ রচনা সাহিত্যিক উৎকর্ষের বিচারে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনার সমকক্ষ না হলেও একজন লেখকের সৃজনপ্রক্রিয়া ও মননজগতের ইতিহাস নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্কিমচন্দ্রের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর সাহিত্যজীবন ছিল বহুমুখী এবং নিরন্তর অনুসন্ধিৎসায় পরিপূর্ণ। উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি ধর্ম, নীতি, সমাজ, ইতিহাস, দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। বিভিন্ন সময়ে সাময়িকপত্রে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ও অন্যান্য রচনার একটি অংশ পরবর্তীকালে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে, আবার কিছু রচনা থেকে গেছে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়। কোনো কোনো রচনা অসম্পূর্ণ থেকেছে, কোনোটি হয়তো লেখকের নিজস্ব বিবেচনায় পরিত্যক্ত হয়েছে। এসব রচনাকে একত্রে পাঠ করলে বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তার বিবর্তন, বিষয় নির্বাচনের প্রবণতা এবং সাহিত্যিক পরীক্ষানিরীক্ষার একটি বিস্তৃততর চিত্র পাওয়া যায়।
‘অগ্রন্থিত’ শব্দটির অর্থও এখানে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। অগ্রন্থিত মানেই অপ্রকাশিত নয়। কোনো রচনা জীবদ্দশায় বা পরবর্তীকালে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে থাকলেও যদি তা লেখকের স্বীকৃত গ্রন্থসমূহে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে, তবে সেটি অগ্রন্থিত রচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার ‘অসম্পূর্ণ’ ও ‘পরিত্যক্ত’ রচনাও একই বিষয় নয়। কোনো লেখা অসম্পূর্ণ অবস্থায় থেকে যেতে পারে লেখকের মৃত্যু, কর্মব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে; অন্যদিকে কোনো রচনা লেখক নিজেই আর এগিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই এই সঙ্কলনে রচনাগুলোর প্রকৃতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রকাশনা-ইতিহাস ও প্রাপ্ত পাঠের প্রতি যথাসম্ভব সতর্ক থাকা জরুরি।
এই সঙ্কলনের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো বঙ্কিমচন্দ্রকে কেবল তাঁর বহুলপঠিত উপন্যাসগুলোর লেখক হিসেবে নয়, একজন নিরন্তর অনুসন্ধানী সাহিত্যিক ও চিন্তক হিসেবে পাঠের সুযোগ সৃষ্টি করা। তাঁর সুপরিচিত সৃষ্টির বাইরে যে লেখকটি কখনো কোনো বিষয় নিয়ে পরীক্ষা করছেন, কখনো নতুন আঙ্গিক অনুসন্ধান করছেন, কখনো একটি ভাবনাকে অসম্পূর্ণ রেখেই সরে যাচ্ছেন—এই রচনাগুলোর মধ্য দিয়ে সেই বঙ্কিমচন্দ্রকে কিছুটা কাছ থেকে দেখা সম্ভব।
তবে অগ্রন্থিত, পরিত্যক্ত কিংবা অসম্পূর্ণ রচনার মূল্যায়নে একটি সতর্কতা অপরিহার্য। লেখকের অসমাপ্ত খসড়াকে তাঁর চূড়ান্ত সাহিত্যিক বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি পরিত্যক্ত রচনার ভিত্তিতে তাঁর সাহিত্যিক অভিপ্রায় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়। এসব রচনাকে বরং তাঁর সৃষ্টিশীল যাত্রার দলিল হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত। কোথায় তিনি থেমে গেছেন, কোথায় সংশোধনের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন, কোন বিষয় তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল এবং কোন ভাবনা শেষ পর্যন্ত পরিণত রূপ পায়নি—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই রচনাগুলোর প্রকৃত গুরুত্ব।
এই সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত রচনাগুলোর পাঠ ও পরিচিতি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে মূল পত্রিকা, প্রামাণ্য গ্রন্থসংস্করণ, বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাবলির বিভিন্ন সংস্করণ এবং নির্ভরযোগ্য গ্রন্থপঞ্জি ও গবেষণাকর্মকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেখানে কোনো রচনার প্রকাশকাল, রচনাকাল, প্রকাশমাধ্যম বা অবস্থান সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে, সেখানে প্রচলিত তথ্যকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ না করে প্রামাণ্য সূত্রের ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ বঙ্কিমচন্দ্রের অগ্রন্থিত রচনার ক্ষেত্রে পাঠ-নির্ণয় ও প্রকাশনা-ইতিহাস নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্রের স্থান তাঁর সম্পূর্ণ ও স্বীকৃত রচনার কারণেই সুপ্রতিষ্ঠিত। অগ্রন্থিত বা অসমাপ্ত রচনা সেই প্রতিষ্ঠাকে নতুন করে প্রমাণ করার জন্য নয়। বরং এগুলো তাঁর সাহিত্যিক সত্তার প্রান্তবর্তী অথচ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে দৃশ্যমান করে। পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের উজ্জ্বল আলোর বাইরে ছড়িয়ে থাকা এই লেখাগুলোর মধ্যে কখনো মিলবে নতুন কোনো ভাবনার আভাস, কখনো পরিচিত বঙ্কিমের অপরিচিত মুখ, কখনো একটি অসমাপ্ত সম্ভাবনা।
‘অগ্রন্থিত বঙ্কিম’ সেই বিচ্ছিন্ন রচনাগুলোকেই একত্রে পাঠের একটি প্রয়াস—যাতে বঙ্কিমচন্দ্রের পরিচিত সাহিত্যজগতের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টির অনাবিষ্কৃত, অসমাপ্ত ও বিস্মৃত প্রান্তগুলিও পাঠকের সামনে উন্মুক্ত হয়।
উল্লেখ্য, বঙ্কিমচন্দ্রের ছড়ানো ছিটানো রচনার সংখ্যা একেবারে নগণ্য নয়, এই সঙ্কলনের বাইরেও কিছু রচনা রয়েছে যেগুলো আমরা ‘সমালোচনা সংগ্রহ’ নামক সঙ্কলনে স্থান দিয়েছি। বর্তমান সঙ্কলনের বাইরে কোন রচনা অন্য কোন সঙ্কলনে যুক্ত হলে যথাস্থানে আমরা টীকায় উল্লেখ করে দিয়েছি।