এ ডল হাউস

(ইবসেনের পুতুল যেখানে ব্রাত্য হয়ে রয়)

হেনরিক ইবসেন

অনুবাদ: মাহবুব সিদ্দিকী, অগুস্ত স্ত্রিন্দবারি

এই পাতাটি মূলগ্রন্থের অংশ নয়; এটি হেনরিক ইবসেন রচিত এবং মাহবুব সিদ্দিকী ও অগাস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ অনূদিত ‘এ ডল হাউস’ নাটকের পরিচিতি, প্রকাশনা-ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন।

বিশ্বখ্যাত নরওয়েজীয় নাট্যকার হেনরিক ইবসেন রচিত কালজয়ী নাটক ‘এ ডল হাউস’ (A Doll's House) ১৮৭৯ সালে প্রথম মঞ্চস্থ ও প্রকাশিত হয়। নারী অধিকার, ব্যক্তিত্বের স্বাধীনতা এবং তৎকালীন সামাজিক ও পারিবারিক ব্যবস্থার অসারতাকে কেন্দ্র করে রচিত এই নাটকটি আধুনিক নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সৃষ্টি।

হেনরিক ইবসেনের ‘ডল’স হাউজ’ (A Doll’s House) নাটকটি এমন এক পারিবারিক জীবনের দরজা খুলে দেয়, যার ভেতরে ঢুকলে প্রথমে মনে হয় সবকিছুই সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সুখের। কিন্তু একটু একটু করে বোঝা যায়—সেই সংসারের সৌন্দর্যের আড়ালে একজন নারীর স্বাধীন সত্তাকে কীভাবে নিপুণভাবে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ইবসেনের এই কালজয়ী নাটক তাই কেবল দাম্পত্য সম্পর্কের গল্প নয়; এটি ব্যক্তিস্বাধীনতা, আত্মপরিচয়, সামাজিক প্রত্যাশা এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতাকাঠামোর বিরুদ্ধে একজন মানুষের আত্মআবিষ্কারের গল্প।

নাটকের কেন্দ্রে নোরা হেলমার। স্বামী টরভাল্ডের চোখে সে আদরের স্ত্রী, সংসারের শোভা, অনেকটা খেলনার মতোই—যাকে ভালোবাসা যায়, আদর করা যায়, কিন্তু সমান মর্যাদায় গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই। নোরাও প্রথমদিকে এই ভূমিকাতেই যেন স্বচ্ছন্দ। কিন্তু নাটকের ঘটনাপ্রবাহ যত এগোয়, ততই প্রকাশ পায় তার জীবনের এক গভীর সত্য। স্বামীর জীবন রক্ষার জন্য সে একসময় গোপনে ঋণ নিয়েছিল এবং সেই ঋণ পরিশোধের জন্য বছরের পর বছর নিজের মতো করে সংগ্রাম করেছে। অথচ যে মানুষটির জন্য সে এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিল, সংকটের মুহূর্তে সেই মানুষটির কাছ থেকেই সে প্রত্যাশিত ভালোবাসা ও মানবিকতা পায় না।

এখানেই নাটকের সবচেয়ে শক্তিশালী নাটকীয় সংঘাত।

নোরা বুঝতে পারে, টরভাল্ড তাকে কখনো একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখেনি। সে ছিল তার কাছে ‘স্ত্রী’, ‘সন্তানের মা’, ‘পুতুল’—কিন্তু স্বাধীন বিবেকসম্পন্ন একজন ব্যক্তি নয়। আরও বড় কথা, নোরা নিজেও এতদিন নিজের পরিচয়কে স্বামীর পরিচয় ও সংসারের ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত তার যে সিদ্ধান্ত, সেটি কেবল স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; এটি নিজেকে আবিষ্কার করার সিদ্ধান্ত।

নাটকের শেষ দৃশ্যটি এ কারণেই বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম আলোচিত সমাপ্তি। নোরার দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যাওয়া শুধু একটি ঘরের দরজা বন্ধ করা নয়—এটি প্রচলিত স্ত্রীধর্ম, সামাজিক ভণ্ডামি এবং আরোপিত নারীত্বের বিরুদ্ধে তার প্রতীকী বিদায়। সে স্ত্রী বা মা হওয়ার আগে একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে জানতে চায়। এই প্রশ্নটি আজও তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক: একজন মানুষের নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কি তার সামাজিক ভূমিকার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?

ইবসেনের অসাধারণত্ব এখানেই যে, তিনি নোরাকে কোনো আদর্শ ‘নারীবাদী চরিত্র’ হিসেবে তৈরি করেননি। নোরা ভুল করে, মিথ্যা বলে, গোপন করে, ভয় পায়, দ্বিধায় পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। তার এই মানবিক অসম্পূর্ণতাই চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। একইভাবে টরভাল্ডও কোনো সরল ভিলেন নয়; বরং সে তার সময়ের সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিনিধি। সে নোরাকে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যেই রয়েছে মালিকানাবোধ এবং শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা। ফলে নাটকটি ‘ভালো স্বামী বনাম খারাপ স্ত্রী’র গল্প না হয়ে দাঁড়ায় সমতার অভাব কীভাবে ভালোবাসাকেও দমনের রূপ দিতে পারে—তার নির্মম বিশ্লেষণ।

বাংলা পাঠকের কাছে এই নাটকের স্বাদ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে মাহবুব সিদ্দিকীর অনুবাদ বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল রচনার বক্তব্যের পাশাপাশি তার পরিবেশ, চরিত্রের স্বর, সংলাপের গতি এবং অন্তর্নিহিত আবেগকে অন্য ভাষায় স্বাভাবিক করে তোলা। নাটকের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল, কারণ অনুবাদটি শুধু পড়ার জন্য নয়—সংলাপ হিসেবে উচ্চারণযোগ্যও হতে হয়।

মাহবুব সিদ্দিকীর অনুবাদের একটি বড় শক্তি হলো সংলাপকে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহে নিয়ে আসার চেষ্টা। ইবসেনের নাটকে দীর্ঘ বর্ণনার চেয়ে কথোপকথনের মধ্য দিয়েই চরিত্রের মনস্তত্ত্ব উন্মোচিত হয়। ফলে অনুবাদে যদি সংলাপ কৃত্রিম বা অতিরিক্ত আক্ষরিক হয়ে যায়, নাটকের প্রাণ অনেকটাই হারিয়ে যায়। এই অনুবাদে সেই বিপদ যথাসম্ভব এড়িয়ে চরিত্রগুলোর কথাবার্তাকে পাঠযোগ্য ও স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা লক্ষ করা যায়।

বিশেষ করে নোরা ও টরভাল্ডের কথোপকথনে ভাষার সূক্ষ্ম পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। টরভাল্ডের কথায় যে পিতৃতান্ত্রিক স্নেহ, কর্তৃত্ব এবং আত্মতৃপ্তি একসঙ্গে কাজ করে, আর নোরার কথায় যে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস জন্ম নিচ্ছে—অনুবাদে এই পরিবর্তনটি ধরা পড়া জরুরি। একটি ভালো অনুবাদ এখানে শুধু ‘অর্থ’ অনুবাদ করে না; চরিত্রের মানসিক বিবর্তনও অনুবাদ করে।

মাহবুব সিদ্দিকীর অনুবাদ পড়ার সময় আরও যে বিষয়টি ভালো লাগে, তা হলো এটি নাটকটিকে অতিরিক্ত দুর্বোধ্য বা ভারী করে তোলার চেষ্টা করে না। বাংলা অনুবাদে অনেক সময় উনিশ শতকের ইউরোপীয় নাটককে এমন এক প্রাচীন ও আড়ষ্ট ভাষায় পরিবেশন করা হয়, যাতে সমকালীন পাঠকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। এখানে ভাষাকে তুলনামূলকভাবে সাবলীল রাখার ফলে নোরার সংকট এবং তার আত্মপরিচয়ের প্রশ্নটি বর্তমান পাঠকের কাছেও সরাসরি পৌঁছে যায়।

তবে ইবসেন অনুবাদের ক্ষেত্রে একটি বিষয় সবসময় মনে রাখা দরকার—মূল সংস্কৃতির সামাজিক ও ভাষিক সূক্ষ্মতা সম্পূর্ণভাবে অন্য ভাষায় প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়। নরওয়েজীয় সমাজের উনিশ শতকের মধ্যবিত্ত পারিবারিক কাঠামো, আইন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও সামাজিক রীতির কিছু সূক্ষ্মতা বাংলা পাঠে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ভিন্নভাবে প্রতিভাত হতে পারে। কিন্তু অনুবাদের সাফল্য মূলত এখানেই যে, সেই সাংস্কৃতিক দূরত্ব অতিক্রম করে নাটকের কেন্দ্রীয় মানবিক সংকটটি পাঠকের কাছে জীবন্ত করে তুলতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ‘ডল’স হাউজ’কে কেবল নারীবাদী নাটক হিসেবে পড়লে এর ব্যাপ্তি কিছুটা কমিয়ে দেখা হয়। এটি একই সঙ্গে আত্মপরিচয়ের নাটক, বিবাহপ্রতিষ্ঠানের সমালোচনা, সামাজিক মুখোশের নাটক এবং ব্যক্তি বনাম আরোপিত পরিচয়ের সংঘাতের নাটক। নোরার প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য—আমি যে পরিচয়ে বেঁচে আছি, সেটি কি সত্যিই আমার নিজের, নাকি সমাজ আমার জন্য সেটি নির্ধারণ করে দিয়েছে?

এই প্রশ্নের কারণেই ইবসেনের নাটক দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও পুরোনো হয়ে যায়নি। আর মাহবুব সিদ্দিকীর অনুবাদ সেই পুরোনো নাটককে বাংলা পাঠকের সামনে এমনভাবে উপস্থিত করার সুযোগ করে দেয়, যাতে নোরার ঘরের দরজাটি শুধু উনিশ শতকের নরওয়েতে নয়, আমাদের নিজেদের সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের দিকেও খুলে যায়।